জার্মানের হামবুর্গ ভ্রমণঃ সাইদুল করিম


জার্মান ভ্রমণের জানা অজানা অনেক কথা নিয়েই, আমার আজকের ভ্রমণ কথা৷ জার্মান ভ্রমণের কিছু কথা লিখা ছিল আর আপনাদের অনুপ্রেরণায় অল্প অল্প লিখাও শুরু করেছি। এইবার ভ্রমণ কথা

জার্মানিতে এই প্রথম আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল দেখলাম; যদিও এটা ঠিক আমাদের দেশের বাস টার্মিনালগুলোর মতো না এবং অত বড়ও না- তবে আশ্চর্য হওয়ার মতোই ব্যাপার। বর্গাকার ঘরটা মাঝখানে সিঁড়ি দিয়ে দু’ভাগে বিভক্ত, সিঁড়ির দু’পাশে ও ঘরটির কোণায় ছড়ানো কিছু বসার বেঞ্চ বিশ্রামঘরের পরিচয়ই বহন করে। আর দু’পাশে ইটের দেয়াল ফুঁড়ে ছোট খুপরি সদৃশ টিকেট কাউন্টারগুলো দেশের বাসটার্মিনালের কথা কিছুটা হলেও মনে করিয়ে দেয়।


অনলাইন-এ টিকেট কিনে ‘মুনস্টার’ থেকে বাসে ওঠার সময় দুই-তিনটা দূর-পাল্লার বাস চোখে পড়লেও বাসগুলো একটা প্লাটফর্মে ছিলো। কিন্তু সেগুলো যাত্রী নামানো আর ওঠানোর জন্য বিরতিতে ছিল এই যা; তা মোটেও ভিন্ন কোন অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয় নি। কিন্তু এখানে নেমেই আমার ভাবান্তর ঘটে- আলাদা আলাদা প্লাটফর্মে ভিন্ন ভিন্ন শহরের উদ্দেশ্য ছেড়ে যাওয়ার জন্য কিংবা ভিন্ন ভিন্ন শহর থেকে এখানে যাত্রী পৌঁছে দিতে এসে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু জার্মানির ভিন্ন ভিন্ন শহরে নয়, সমস্ত ইউরোপজুড়ে নেটওয়ার্ক বিস্তৃত; ইউরোপের সব বড় বড় শহর বার্লিন-মিউনিখ-রোম-প্যারিস-প্রাগ-ওয়ারস-ভিয়েনা-জুরিখ-মাদ্রিদ-বার্সেলোনা সবজায়গার সাথেই সংযোগ আছে।



মাথাটা জীম জীম করছে কফি কিনলাম। কফি নিয়ে বাইরের ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম বিশ্রামঘরটি আর টিকেট কাউন্টারগুলো- জার্মানির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর-বন্দর নগরী এই হামবুর্গ-এ এসে জার্মানিতে প্রথম আন্তঃনগর বাসটার্মিনালের অস্তিত্ব আবিষ্কার করলাম।

কফিতে চুমুক দেওয়ার সাথে সাথেই টের পেলাম চিনি মেশাইনি; তেঁতো কফি শেষ হবার পর ভাবলাম আশপাশটা একটু ঘুরে দেখি; বের হতেই চোখে পড়ল পাশের জাদুঘরটি-“Museum für Kunst und Gewerbe” (Museum of Arts and Crafts)। জাদুঘর মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, অন্যরকম একটা অনুভূতি, বিচিত্র সব সংগ্রহ; হয়তো নিয়ে যাবে কোন এক সুদূর অতীতে, হয়তো ভিন্ন কোন এক জগতে ভিন্ন কোন সময়ে। তবে এইমুহূর্তে যে অদ্ভুত ভাবনা মাথায় এসেছে তা আগে কখনো আসেনি- “জাদুঘর! সংগ্রহশালা! লুট করে-চুরি করে আনা- প্রকৃত দাবীদারদের প্রতারিত করে, বঞ্চিত করে নিজদের সমৃদ্ধ করা।” আবার মনে হল, “এই কাজটি না করলে, এভাবে একজায়গায় জড়ো না করলে হয়তো পৃথিবী থেকে প্রাচীন-অমূল্য অনেক কিছুই বিলীন হয়ে যেতো।” নিজের মনে তর্ক করতে করতে যখন জাদুঘরে প্রবেশ করি।


জার্মানির আনাচে-কানাচে ‘ম্যাকডোনাল্ড’ বা ‘বার্গার কিং’ ছড়িয়ে থাকলেও ‘কেএফসি’ এর সংখ্যা খুবই কম; মানে আমার চোখে বেশি পড়েনি। যাই হোক ‘কেএফসি’-এর ফ্রাইড চিকেন দিয়ে ক্ষুধা মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হামবুর্গ শহর দেখার জন্য।


প্রথমেই গেলাম হামবুর্গের ‘টাউন হল’ দেখতে, শতবর্ষেরও বেশি পুরনো এই টাউন হল। ইউরোপের ভবনগুলোর একটা ব্যাপার আমার কাছে খুব ভালো লাগে, তা হল ভবনের টাওয়ার; শতবর্ষীয় ভবনগুলোর অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হল এই টাওয়ার- সবকিছু ছাড়িয়ে উঁচুতে উঠে যাওয়া এক মনোভাব। এই ভবনের টাওয়ারটির উঁচু থেকে দৃষ্টি আস্তে আস্তে নিচে নামাতে থাকলাম- চোখে পড়ল ঘড়িটি; ঘড়ি দেখলেই মনে হয় কারো কারো কাছে জীবন মানে সময় অর্থেৎ জীবন যতক্ষণ আছে সময় ততক্ষণ থাকবে- সময় চলে যাওয়া তাদের কাছে কোন দুঃশ্চিন্তার ব্যাপার নয়; আবার কারো কারো কাছে সময় মানে জীবন অর্থাৎ প্রতিটা মুহূর্ত তাদের কাছে মূল্যবান।  আরও আছে হামবুর্গের দেবী হ্যামোনিয়া-এর মোজাইক করা মূর্তি। হামবুর্গে দেবীদের বেশ কদর; ভবনটির অপরপাশে আছে হাইজিয়া দেবীর (Hygieia, গ্রীক মিথলজিতে স্বাস্থ্যের দেবী) মূর্তি সম্বলিত ঝরনা।



নগর ভবনের সামনের ‘ক্রিস্টমাস মার্কেট’, নয়্যার ভাল্‌ (Neuer Wall) সড়ক- যে সড়কের দুপাশ জুড়ে দামী দামী সব ফ্যাশন ব্র্যান্ডের দোকানপাট, ঘুরে চলে এলাম বিনেন-আলস্টের লেকের (Binnenalster Lake) পাড়; এর এক দিকে এলবে (Elbe) আর অন্য দিকে প্রমোদ লেক আউসেন-আলস্টের (Aussenalster) যুক্ত। আউসেন মানে বাইরের; আউসেন-আলস্টের শহর-প্রাচীরের বাইরে ছিল বলে এরকম নাম। এক সময় এটা ছিল কারখানার বর্জ্য ফেলার জায়গা।  এখন সেই শহর প্রাচীর নেই, বর্জ্যে পরিপূর্ণ সেই লেকও নেই- সময়ে পরিবেশের প্রয়োজনে সব বর্জ্য সরে গিয়ে পরিষ্কার পানি এলবে নদীতে মিশেছে।

ইয়ুংসফের্নস্টাইগ (Jungsfernsteig) নামক জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছি লেকের মাঝের ক্রিসমাস ট্রি’র দিকে কিংবা তা ছাড়িয়ে দূরের আউসেন-আলস্টের, আর ভাবছি কোন এক পড়ন্ত বিকেলের কথা।



এলবে’র পাড়; পড়ন্ত বিকেল কিন্তু সূর্যের বিকিরিত আলোকছটার খুব অল্পই বোঝা যাচ্ছে কুয়াশাঢাকা এই বিকেলে। কুয়াশা কেটে আসা সুর্য্যরশ্মিকে বড়ই ক্লান্ত মনে হয় আর এরই মাঝে ব্যস্ত বন্দরের আবছা আবছা ক্রেনগুলো মনে হচ্ছে দূরের কোন দৈত্য। ফেরী করে নদী থেকে একটু ঘুরে আসা যাক। এলবে’র এই ফেরিগুলো একদিকে যেমন বিভিন্ন গন্তব্যমুখী মানুষগুলোকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, অন্যদিকে তেমনি নদীপথে ভ্রমণের আনন্দটুকুও দেয়। একই সাথে গন্তব্যে পৌছানো আবার ডকে দাঁড়িয়ে মৃদুমন্দ বাতাস আর দু’পাশের দৃশ্য উপভোগ করার জন্যই এই ফেরিভ্রমণ; তাই করছি- একপাশে বন্দর আর একপাশে শহর দেখতে দেখতে ফেরির সাথে অস্তগামী সূর্যের দিকে এগিয়ে চলছি। কিন্তু বেশিক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গেল না; কুয়াশা ভেদ করে আসা ক্লান্ত সূর্যরশ্মির উষ্ণতা শীতল বাতাসের কাছে হার মেনে গেল। নিচে চলে এলাম, যেখানে কাঁচের দেয়াল ভেদ করে শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়া বাতাস পৌঁছাতে পারবে না।

গল্পের এক ফাঁকে বাইরে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা নামছে; কুয়াশা আর অন্ধকার ঘিরে ফেলছে সবকিছু চারিদিক থেকে- কাছের বন্দরটি আবছা হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে- বন্দরের জ্বলে উঠা আলোগুলোকে মনে হচ্ছে আকাশে ছড়ানো তারার মেলা। আর এ পাশে শহরটিকে মনে হচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে কোন নর্তকীর আবছায়া যার পোশাকে প্রতিফলিত আলোর মত জ্বলজ্বল করছে শহরের বাতিগুলো।



এলবে’র এপার-ওপারের ঘাটগুলো ঘুরে ফেরিটি যখন শুরুর ঘটটিতে ফেরত আসল, আমরা নেমে পড়ি। রাতে একটা নিমন্ত্রণ ছিল, আমরা সেই উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। রাতের খাবার- আড্ডা শেষ করে যখন বন্ধুর বাসায় পৌঁছোলাম তখন বেশ ক্লান্ত। এখানেই আমার রাতের থাকার ব্যবস্থা; অতএব, ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দেওয়াই যায়।



গতরাতের পরিকল্পনা অনুসারে ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্থানীয় একটা মাছের বাজার দেখতে যাওয়ার কথা। মাছের বাজার আকর্ষণীয় হয়ে উঠার কারণ হল- জার্মানিতে সাধারণত মাছ প্রক্রিয়াজাত করার পর বিক্রী করা হয়, আর সেই হেতু মাছের কাঁচা বাজার দেখা যায় না; এটা বন্দর শহর বলেই হয়তো প্রতিদিন ভোরে এখানে মাছের বাজার বসে; তবে এর স্তায়িত্বকাল আমাদের গ্রামের মাছের বাজারের মতই সংক্ষিপ্ত, সকাল ৯টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।



কুয়াশা’র একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম, একটা স্তর ভারী, উপরের স্তরটা একটু হালকা- দূরের একটা টাওয়ারের উপরের অংশ আবছা দেখা গেলেও নিচের অংশটুকু একেবারেই দেখা যাচ্ছে না; আর টাওয়ারের মাথাটাকে মনে হচ্ছে ভিনগ্রহী কোন নভোযান।

ইউরোপের শহরগুলোর এ এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য, শহরের ভিতরের নদী বা খালের ওপরে একটু পর পরই সেতু দেখা যায়।

এপাশ-ওপাশ করে একটু-একটু হেঁটে চলছি এক ধরণের অন্যমনস্কতা নিয়ে- এই অন্যমনস্কতাটা হয়তো সকালের পরিবেশ দ্বারা একটু প্রভাবিত কিংবা ভাবুক হৃদয়ের ব্যস্ততা থেকে ছুটি পেয়ে নিজেতে একটু ব্যস্ত হবার প্রয়াশ। হাঁটতে হাঁটতেই ভাবছি- এই যে পর্যটকেরা, ভ্রমণবিলাসীরা ছুটে চলছে শহর থেকে শহরে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে, একি কেবল সুন্দরকে দেখার আগ্রহেই? শহরে শহরে সুদৃশ্য ভবন কিংবা স্থাপত্য দেখব বলে? জাদুঘরে সংরক্ষিত ইতিহাস দেখব বলে? ইতিহাসের গল্প জানব বলে? কেবলি কি জানার কিংবা দেখার তাড়না- নাকি সারা পৃথিবীকে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়া নীরবে বা উচ্চস্বরে, নিজের শরীরের গন্ধ ছড়িয়ে দেওয়া- এই শহরে, এই পথে, এই বাতাসে, এই কংক্রিটের ফুটপাতে, কিংবা পৃথিবীর গন্ধ মাখিয়ে নেয়া নিজের গায়ে, কিংবা শুধুই তাকিয়ে দেখা পাতাবিহীন কংকালসার দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের সারির দিকে বা তাকিয়ে থাকা রাস্তার বুক ফেঁড়ে চলে যাওয়া ট্রামলাইনের দিকে।


একটা শহরে কী দেখতে হয়? কী দেখার আছে একটা শহরে? জীবনের ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, ভবনের উচ্চতা নাকি চার্চের শূন্যতা? শুনেছি, হামবুর্গ শহরটা যত না দেখার তার চেয়ে বেশি উপভোগের, আমাদের দেশের পালা-পর্বণের মতোই এখানে উৎসব আয়োজনের শেষ নেই- সব মনমেজাজের মানুষের জন্যই কোন না কোন অনুষ্ঠান লেগে থাকে প্রতি সপ্তাহে। আমার কেন যেন মনে হয় শহরের এ সৌন্দর্য্য দেখতে হলে, উপভোগ করতে হলে মিশতে হয় শহুরে জীবনের সাথে, নতুবা অনেক কিছুই দেখা হয়ে ওঠে না; অন্যদিকে গ্রামের সৌন্দর্য্য তার সাথে মিশতে হয় না, গ্রামের সারল্যই পথিককে টেনে নেয়। গ্রামের ছেলে বলেই হয়তো আমার এমন মনে হয়- গ্রামের যেকোন গল্পই পরিচিত মনে হয়, শ্রুতিমধুর লাগে, হয়তো চরিত্রগুলো আমার পরিচিত নয় কিন্তু মনে হয় এ যেন কোন চেনা মানুষ, গল্পের সেই আঁকাবাঁকা মেঠোপথের ধূলো আমার পায়ে না লাগলেও তা স্মৃতিকে আলোড়িত করে; হোক সেটা সুদূর সাইবেরিয়ার কোন গাঁওয়ের গল্প, কোন রাখালের গল্প, দলবেঁধে জলে দাপিয়ে বেড়ানোর গল্প- সবকিছুকেই মনে হয় স্মৃতিতে গাঁথা কোন স্মৃতির অংশ, প্রতিটি সৌন্দর্য্যই পরিচিত সৌন্দর্য্য হয়ে ধরা দেয়, প্রতিটি গল্পতেই নিজের অস্তিত্ব টের পাই।

কিন্তু শহরের সৌন্দর্য্য? শহরের সৌন্দর্য্য খুঁজে নিতে হয় ইট-পাথরের ব্যস্ত নাগরিক জীবনের মধ্য থেকে। ঢাকা শহরের কথাই যদি ধরি-এখানে লুকিয়ে থাকে গল্প আর ইতিহাস স্যাঁতস্যাঁতে ইটের দেয়ালে, শ্যাওলা পরা পুরনো বাড়িতে, ঝুল বারান্দায়, বাসার ছাদে, রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে- প্রতিদিনের ধূলোপড়া নাগরিক জীবনে।



অদ্ভুত এই পথচলা! গভীর মনোনিবেশে কিছু চিন্তা করতে করতে পথহাঁটা এটা নয় কিংবা চলা নয় আনমনে সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে; বরঞ্চ মস্তিষ্কের একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এই চলাটা আর অন্য একটা অংশ ভেবে যাচ্ছে খেলাচ্ছলে- পথের সাথে সঙ্গতি রেখে; হয়তো এটা ভাবনার একটা খেলা যাতে করে ভ্রমণের এই একলা সময়টা চলে যায়।

এই হাফেন সিটি আসলে হামবুর্গ বন্দরের পরিত্যাক্ত অংশে পরিকল্পিত একটা শহরতলি গড়ে তোলার প্রকল্প যেখানে অফিস, হোটেল, দোকান, বাসস্থল থাকবে; তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং হামবুর্গ শহর প্রায় ৪০ ভাগ বৃদ্ধি পাবে। এই শহর নির্মাণ সম্পন্ন হবে ২০২৫ সালে অর্থাৎ আমরা যখন শহরে প্রবেশ করি তখনও শহরটি গড়ে উঠছে। যেই সেতুটা দিয়ে প্রবেশ করি তার শুরুতে স্বাগত জানানোর জন্যই বোধ হয় দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে হ্যামোনিয়া আর অয়রোপা (Europa) দেবী।

হাফেন সিটি- জনমানবহীন এক শহর; ভুল বললাম মানুষের আগমনের অপেক্ষায় থাকা এক শহর। ঢুকতেই চোখে পড়লো সারি সারি মানুষ ছিপ নিয়ে বসে আছে- মৎস শিকারি। আমরা ঘুরতে থাকলাম- ফাঁকা বাড়িঘরের মধ্য দিয়ে, রাস্তা দিয়ে; একের পর এক সেতু- কিছুদূর পর্যন্ত ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ালো যে এক সারি দালান তার পরে একটা খাল, তারপর আবার দালানের সারি। রাস্তা একেবারে ফাঁকা নয়, মানুষজনের চলাচল আছে- তবে সবাই ঘুরতেই এসেছে এদিকটায়।


 

ঘুরোঘুরি শেষে হাফেন সিটি ছেড়ে মূল শহরে যখন ফেরত আসলাম তখন পেটে ক্ষুধা টের পেলাম। একটা পর্তুগীজ রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবারটা সেরে নিলাম। শীতের এ সময়টা এ দেশে সূর্যটা দুপুরের পর যেন ধপ করে নেমে যায়; বাস থেকে নামতেই সন্ধ্যা নেমে গেল। বন্দরের বাতাসে আরো কিছু সময় কাটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরলাম।



সকালে বিদায় নিয়ে  হামবুর্গ ভ্রমণ এর ইতি টেনে ফিরতি পথ ধরলাম- আবারো বাসে। এখানে সন্ধ্যাটা যেমন চট করে নামে, সকালটাও আসে তেমনি দেরি করে। বাসে যখন ওঠলাম তখনো দিনের আলো ফুটেনি। বাস চলতে শুরু করল আমাকেসহ অন্যান্য যাত্রী নিয়ে। বিদায় নেওয়ার আগে ধার করা রিচার্ড ডকিন্স এর ‘দ্যা সেলফিশ জিন’ বইটা ব্যাগ থেকে বের করলাম- পড়বো নাকি একটু ঘুমিয়ে নেব এই যখন ভাবছি তখন দৃষ্টি চলে গেলে বাইরে- চলে গেল বলার চেয়ে বলা ভালো দৃষ্টি টেনে নিল। সকালের এ মনোহারী রূপের বর্ণনা দেওয়ার সামর্থ আমার নাই, সে চেষ্টাও করবো না। শুধু বলতে ইচ্ছে করছে বহুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ হয়তো এই রূপ দেখেই বলেছিলেন-

জাগরণে যায় বিভাবরী–
আঁখি হতে ঘুম নিল হরি মরি মরি॥
যার লাগি ফিরি একা একা– আঁখি পিপাসিত, নাহি দেখা,
তারি বাঁশি ওগো তারি বাঁশি তারি বাঁশি বাজে হিয়া ভরি মরি মরি॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *