শ্রীলংকা ভ্রমন কথাঃ সাইদুল করিম

শ্রীলংকা (Sri Lanka), আদি নাম সিলন যা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। ভ্রমণ জগতে বর্তমানে খুব জনপ্রিয় একটি গন্তব্যের নাম। এর প্রশাসনিক রাজধানীর নাম শ্রী জয়াবর্ধেনেপুরা কোট্টে। এর প্রধান শহর কলম্বো। শ্রীলঙ্কা চা, কফি, নারিকেল, রাবার উৎপাদন ও রফতানিতে বিখ্যাত। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংবলিত সমুদ্রসৈকত, ভূদৃশ্য তদুপরী সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শ্রীলঙ্কাকে সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

শ্রীলংকার দর্শণীয় স্থানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান হচ্ছে কলম্বো, অনুরাধাপুর, এডামস পিক, সিগরিয়া রক, , শ্রীলংকার জাতীয় জাদুঘর প্রভৃতি। শ্রীলংকার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান বুদ্ধমন্দির কেলানিয়া রাজা মহাভিহার যা কলম্বোতে অবস্থিত। প্রত্যেক জানুয়ারি মাসে এ মন্দিরে ধার্মিক অনুষ্ঠান পেরাহেরা অনুষ্ঠিত হয়।

ক্যান্ডিতেও যেতে ভুলবেন না শ্রীলংকা বেড়াতে গেলে। এখানে রয়েছে দ্যা টেম্পল অফ টুথ, দ্যা ওল্ড ওয়েল প্যালেস কম্পাউন্ড, লঙ্কাতিলকা মন্দির, এম্বেকা মন্দির যা অবশ্যই দেখার মতো জায়গা। ক্যান্ডিকে শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়।

শ্রীলংকা এই উপমহাদেশেই অবস্থিত হওয়ায় শ্রীলংকা বেড়ানোর খরচ অন্য অনেক দেশের তুলনায় কম। যারা বিমানে ঢাকা থেকে আসতে চান তারা মিহিন লংকা এয়ার লাইন্স ব্যবহার করতে পারেন। এটা শ্রীলংকার বিমান। এছাড়া সরাসরি শ্রীলংকা না এসে ভারত হয়েও আসতে পারেন আপনি। এভাবে আসতে চাইলে কলকাতা থেকে ট্রেনে চেন্নাই গিয়ে সেখান থেকে বিমানে করে কলম্বো যেতে হবে। কলম্বো আসার পর বাসে বা ট্রেনে শ্রীলংকার যে কোন জায়গায় যেতে পারবেন। অথবা জেট এয়ারওয়েজে দিল্লি হয়ে কলম্বো আসা অনেক সহজ।

Hotel Lazani best place

লম্বো– শ্রীলংকায় সনাতন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেল পেতে চাইলে কলম্বো (Colombo) ঘুরে দেখার কোনও বিকল্প নেই। এখানে যেমন আছে ঐতিহ্যগত নিস্তব্ধতা, তেমনি আধুনিক উজ্জ্বলতাও।

Amali and Me

ইতিহাস, সংস্কৃতি, বৌদ্ধ দর্শন ইত্যাদিতে আগ্রহী হলে একটা গোটা দিন রেখে দেন জাতীয় যাদুঘরের জন্য। জাতীয় যাদুঘর দালানটা খুব সুন্দর, সম্ভবত উপনিবেশিক আমলে তৈরি। যাদুঘরের সামনে বট গাছের নিচে শ্বেতশুভ্র ধ্যানরত বুদ্ধের মূর্তি আছে। যারা বৌদ্ধ দর্শনে আগ্রহী তাদের জন্য গোটা শ্রীলঙ্কা জুড়ে দেখার, শোনার, শেখার অনেক কিছু আছে। স্থিরবাদী (থেরাভাদা) বৌদ্ধ দর্শনের ঘাঁটি হিসেবে মনে করা হয় শ্রীলঙ্কাকে। গল ফেস গ্রিন বিচও কলম্বোর অন্যতম উলেখযোগ্য সৌন্দর্যের একটি।

visit Nature with Amali

যেখানে সুনীল সমুদ্র আর সমুদ্রের ঢেউ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ওয়াটার স্পোর্টসের ব্যবস্থা। এখন যদিও কমার্শিয়াল সেন্টারে পরিণত হয়ে গেছে এলাকাটা তার পর্তুগিজ এবং ডাচ পিরিয়ডের ফোর্টের আবেদন একটুকু কমেনি। এই এলাকার অসংখ্য দর্শনীয় স্থান একটু কষ্ট করে হেঁটেই দেখে নেওয়া সম্ভব।

Colomb

সাগরের পাশেই বিশাল মাঠে বিকাল বেলা লোকে ঘুড়ি ওড়ায়, যুবক-যুবতিরা বসে প্রেম করে, বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে আসে। খুব মনোরম পরিবেশ।

সাগরের পাশেই বিশাল মাঠে বিকাল বেলা লোকে ঘুড়ি ওড়ায়, যুবক-যুবতিরা বসে প্রেম করে, বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে আসে। খুব মনোরম পরিবেশ।

সাগরের পাশেই বিশাল মাঠে বিকাল বেলা লোকে ঘুড়ি ওড়ায়, যুবক-যুবতিরা বসে প্রেম করে, বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে আসে। খুব মনোরম পরিবেশ।

Wonder full Moment with Amali and her brother

কলম্বো থেকে ১২ কিমি. দূরে অবস্থিত বিচের নাম মাউন্ট লাভিনিয়া। ১৮০৫ সালে তৈরি গভর্নর হাউস এখানে অবস্থিত। যা এখন মাউন্ট লাভিনিয়া হোটেলে পরিণত হয়েছে। এলিফেন্ট শো এর জন্য বিখ্যাত এক চিড়িয়াখানার নাম, দেহিওয়ালা জু। ১১ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই চিড়িয়াখানায় দুর্লভ প্রজাতির পশুপাখি রয়েছে।

এছাড়া কলম্বোতে দেখার মতো রয়েছে কেলানিয়া রাজা মহাবিহার। জানুয়ারি মাসে প্রতিবছর এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পেরাহেরা অনুষ্ঠিত হয়।

I have visited many places in Sri Lanka with Amli . Amali Really Helpful Friend, Thanks Amali To show so many beautiful sights

অনুরাধাপুর– অনুরাধাপুর (Anuradhapura) শ্রীলংকার প্রাচীন সভ্যতার ভিত্তিভূমি এবং পুরাতাত্ত্বিক স্থাপনার জন্য বিখ্যাত। ইউনেস্কো একে বিশ্ব সভ্যতার একটি উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। শ্রীলংকার বর্তমান রাজধানী কলম্বো থেকে ২০৫ কিলোমিটার উত্তরে ঐতিহাসিক মালভাথু ওয়া নদীর তীরে এ শহর অবস্থিত। প্রাচীনকাল থেকে এখনো জনবসতি রয়েছে পৃথিবীর এমন শহরগুলোর মধ্যে অনুরাধাপুর অন্যতম। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে ১১শ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ শহর শ্রীলংকার রাজধানী ছিল। এ সময়কালে রাজনৈতিক, বাণিজ্যক ও নাগরিক সুবিধার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী শহর ছিল অনুরাধাপুর। প্রায় ১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত প্রাচীন শহরটি বৌদ্ধদের কাছে পবিত্র বলে গণ্য।

অনুরাধাপুর-শ্রীলঙ্কা

প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে জানা গেছে, খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে ইতিহাসের ঊষালগ্নেই এখানে জনবসতি গড়ে ওঠে। এ এলাকার মানবসমাজ লোহার ব্যবহার আয়ত্ত করেছিল। ৭০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এখানে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। কারণ নদী অববাহিকায় অবস্থিত এ এলাকার জমি ছিল উর্বর এবং এখানে সেচ সুবিধা ছিল। ৫০০ থেকে ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এখানে নগর গড়ে ওঠে। রাজা পান্ডুকাভয় এই নগরের পরিকল্পনা করেন বলে শ্রীলংকার ইতিহাস গ্রন্থ ‘মহাবংশে’ উল্লেখ করা হয়েছে। মহাবংশতে অনুরাধাপুর সম্পর্কে বলা হয়েছে, রাজা পান্ডুকাভয় এখানে দীঘি খনন, সাধারণ সমাধিক্ষেত্র, বধ্যভূমি, রানীর মন্দির, মহাবলিস্থান প্রভৃতি নির্মাণ করেন। তিনি সন্ন্যাসীদের জন্য একটি অতিথিশালা নির্মাণ করেন। ব্রাহ্মণদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন একটি আশ্রম এবং রোগীদের জন্য চিকিত্সালয় ও বিশ্রাম কেন্দ্র। বলা হয়ে থাকে, মহারাজ পান্ডুকাভয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অনুরাধাপুরে তার রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি একটি সুসংহত পরিকল্পনা অনুসারে রাজধানী ও নগরীর উপকণ্ঠ নির্মাণ করেন এবং অভয়বাপী নামে একটি জলাধার নির্মাণ করেন। এছাড়াও তিনি ‘কালবেলা’ ও ‘চিত্তরাজা’ নামে যক্ষের উদ্দেশ্যে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজত্বকালে দাস ও চণ্ডালরা নগরের উপকণ্ঠে আলাদা গ্রামে বাস করতেন। তিনি নগর ও গ্রামের সীমানা নির্ধারণ করেন। ২৫০ থেকে ২১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজা দেবনামপ্রিয়র সময়ে শ্রীলংকায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার শুরু হয়।রাজা দেবনামপ্রিয় ছিলেন ইতিহাসখ্যাত ভারতীয় সম্রাট অশোকের সমসাময়িক। বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নগর হিসেবে অনুরাধাপুরের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। এ সময় থেকেই গড়ে উঠতে থাকে বিখ্যাত সব স্থাপনা। রাজা কূটকন্বাতিশ্যর সময় নগর প্রাচীর নির্মিত হয়। পরে রাজা বাসবের সময় প্রাচীরের উচ্চতা বাড়ানো হয় ও প্রহরী ঘর নির্মিত হয়, যার ধ্বংসাবশেষ আজও আছে।

অনুরাধাপুর-শ্রীলঙ্কা

পর্যটকরা অনুরাধাপুরের যেসব স্থাপনা দেখে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হন তার মধ্যে আটটি স্থানকে বলা হয় আট মহাস্থাপনা। এই আট মহাস্থাপনা হলো শ্রীমহাবোধি, রুয়ানওয়েলিশ্ব, থুপারামায়া, লোভমহাপয়, অভয়গিরি, দাগব, জেতবনরাম, মিরিসাভেটিস্তূপ এবং লংকারাম। রাজা বাসব অনুরাধাপুরের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা অনেক বৃদ্ধি করেন। তিনি নাগরিকদের জন্য প্রচুর দীঘি খনন করেন। এই জলাশয়গুলোতে পানি সরবরাহের জন্য ছিল বাঁধানো নালা। নগরে ছিল উদ্যান। এসব উদ্যানের মধ্যে রনমাসু উদ্যান শুধু রাজপরিবারের সদস্যরাই ব্যবহার করতে পারতেন। সাধারণ নগরবাসীর জন্য আলাদা উদ্যান ছিল। সাধারণ মানুষের চিকিত্সার জন্য বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ছিল। চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে রাজা দ্বিতীয় উপতিশ্য প্রতিবন্ধীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেন। পরবর্তী রাজা বুদ্ধশ্য ছিলেন চিকিত্সাবিদ্যায় পারদর্শী। তিনি প্রজাদের জন্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এই হাসপাতালের ধ্বংসাবশেষ আজও পর্যটকদের বিস্মিত করে। রাজা বুদ্ধশ্য পশুদের চিকিত্সার জন্যও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

অনুরাধাপুরের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে পর্যটকরা এখনো যেগুলোর প্রতি বিশষ আগ্রহবোধ করেন সেগুলো হলো রত্নপ্রাসাদ, দক্ষিণাস্তূপ, ইশুরুমুনিয়া, মাগুল উয়ানা, রানীর প্রাসাদ ও মন্দির, সেলাসেটিয়া, কিরিবাথ বিহার, নাকবিহার, কুট্টাম পকুনা, সমাধিমূর্তি, তোলুইলা মূর্তি ইত্যাদি। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে তিন ধরনের স্থাপনা রয়েছে। প্রথম ধরনের স্থাপনা হলো ঘণ্টাকৃতির উপাসনালয় ভবন, দ্বিতীয় ধরনের স্থাপনা হলো প্রাসাদ আর তৃতীয় ধরনের স্থাপনা হলো কারুকার্য করা বাঁধানো ঘাটসহ দীঘি। ঘাটে রয়েছে বসার বেদি ও বিভিন্ন ভাস্কর্য। এই দীঘিগুলো নগরীর বিভিন্ন স্থানে এবং আশপাশের জঙ্গলে ছড়িয়ে রয়েছে।

এখানে দেখতে পাবেন ১৩ মিটার উঁচু গ্রানাইট পাথরের তৈরি বুদ্ধের স্ট্যাচু আওকনা বুদ্ধ। রাজা দাথুসেনের শাসনকালে নির্মিত হয়েছে এটি। পাবেন তৃতীয় শতাব্দীতে নির্মিত ইসরুমিনিয়া মন্দির। এই মন্দির বিখ্যাত রক কার্ভিংসের জন্য। এখানেও মিস করা যাবে না রাজা দুতুগামানুর ছেলে সালিয়া এবং তার প্রেমিকার কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত খোদাইচিত্র ‘লাভারস’ নামের কার্ভিং। অসাধারণ খোদাই চিত্র এটি। অনুরাধাপুরের আরও বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে এর মনাস্ট্রি এবং স্তূপগুলো। অভয়গিরি এখানকার সবচেয়ে বড় মনাস্ট্রি কমপ্লেক্স। এছাড়াও এখানে দেখার আছে মিহিনতালের মন্দির, জেথাওয়ানের মনাস্ট্রি, ওয়ানভেনির সেয়া।

বর্তমানে অনুরাধাপুরে সিংহলি, শ্রীলংকান তামিল, ভারতীয় তামিল, শ্রীলংকান মুরসহ বিভিন্ন জাতির প্রায় ৫৬ হাজার ৬৩২ জন অধিবাসী রয়েছে। কথিত আছে, হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণে বর্ণিত রাক্ষসরাজ রাবণের রাজধানী ছিল অনুরাধাপুরে। পরে রাম এ রাজধানী পুড়িয়ে দেন।

ক্যান্ডি- ক্যান্ডিকে (Kandy) শ্রীলংকার সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়। শ্রীলংকার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ক্যান্ডি। কলম্বো থেকে ১১৫ কিমি. দূরে অবস্থিত এই শহর। এখানেই অনুষ্ঠিত হয় শ্রীলঙ্কার সবচাইতে বর্ণাঢ্য উৎসব ‘এসালা পেরাহেরা’। ক্যান্ডির দক্ষিণে আছে দেশের সবচাইতে উঁচু এলাকা ‘নুয়ারা এলিয়া’। একে দেশের প্রসিদ্ধ চা শিল্পের কেন্দ্র বিন্দু বলা চলে।

ক্যান্ডি শ্রীলঙ্কা

ক্যান্ডি শহরের মাঝখানে বিশাল হ্রদ। হ্রদের চারপাশে বুদ্ধের দাঁতের মন্দির, সিংহল সংস্কৃতি কেন্দ্র (এখানে নিয়মিত ঐতিহ্যবাহী নাচ দেখা যায়), উডাওয়াত্তাকেলে অভয়ারণ্য সহ আরও অনেক কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উডাওয়াত্তাকেলে অভয়ারণ্যে প্রচুর জীব জন্তু আছে। প্রবেশ পথের কাছেই একটা জায়গায় বানরের দল ঘোরাফেরা করে। তবে এরা খুব নিরীহ বানর।

ক্যান্ডি শহর থেকে যেতে পারেন টুথ রেলিক টেম্পল। শ্রীলঙ্কার অন্যতম পবিত্র ধর্মস্থান। গৌতম বুদ্ধের দাঁত এনে এই মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন রাজকন্যা হেমামালী ও তার স্বামী যুবরাজ দন্ত। তার পরে কত যুদ্ধ! বিদেশি শক্তির লাল চোখ দেখেছে এই মাটি, তার চিহ্ন রয়েছে মন্দিরের আনাচে কানাচে। রয়েছে তথাগতের বোধিবৃক্ষও। ইতিহাস বাদ দিলেও ভারী সুন্দর, নিপুণ ভাস্কর্যের সাক্ষী এই মন্দির। সেখান থেকে মাত্র ন’মিনিট দূরেই পেরাডেনিয়ার রয়্যাল বটানিক্যাল গার্ডেন। প্রায় ১৪৭ একর জায়গা জুড়ে এই বাগানে রয়েছে তিনশোরও বেশি অর্কিড, অসংখ্য গাছ— সে এক সমারোহ। গাছ-গাছালিতে আগ্রহ থাকলে একটা গোটা দিন রাখতে হবে এই স্থান ঘুরে দেখার জন্য।

এডামস পিক– শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের শ্রীপাডা নামক প্রদেশের রত্নাপুরা জেলায় এডামস পিক অবস্থিত যা ২২৪৩ মিটার বা ৭ হাজার ৩৫৮ ফুট উঁচু এবং আকৃতিতে কোণের মত দেখতে। শুধু মুসলিম নন, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ – এই তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছেও অতি পবিত্র এই চূড়াটি বা পাহাড়টি। সকলের ধারনা আদম পাহাড়েই আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আঃ) বেহেশত থেকে সরাসরি আগমণ বা পতিত হয়েছিলেন। চূড়াটির চারদিকে সবুজের বিপুল সমারোহ, মাঝেমধ্যে পাহাড়ি উঁচু নিচু টিলা। পাহাড়ি চূড়ার আশপাশে রয়েছে অসংখ্য ছো্ট নদী এবং পাহাড়ি ঝরনা। সব মিলে এক মায়াবী নয়নাভিরাম দৃশ্য।

এডামস পিক শ্রীলঙ্কা

এ রয়েছে একটি প্রকাণ্ড পাথরখণ্ড। এর উচ্চতা ৮ ফুট। এর ওপরেই রয়েছে ওই পদচিহ্ন যা আদম (আঃ) এর পায়ের যে চিহ্ন বলে বিশ্বাস করা হয়। পদচিহ্ন এর পরিমাপ হচ্ছে প্রায় ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি, দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ হচ্ছে ২ ফুট ৬ ইঞ্চি। বৌদ্ধ ধর্ম মতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে এই পদচিহ্ন আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কৃত হওয়ার পরে পদচিহ্নের চতুর্দিকে ঘেরাও দিয়ে রাখা হয়েছে। যুগ যুগ ধরে শত শত পর্যটক পরিভ্রমণ করেছে চূড়াটিতে। বিশ্বের চূড়াটিতে যারা পরিভ্রমণ করেছেন তারা এর চতুর্দিকে পরিদর্শন করা ছাড়াও স্পর্শ করে দেখেছেন আদম (আঃ) এর পদচিহ্ন। শুধু শ্রীলংকাবাসী নয়, বাহিরের অনেক দেশের মুসলমান বিশ্বাস করেন হজরত আদম (আঃ) কে যখন পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল তখন তিনি প্রথম পা রাখেন শ্রীলঙ্কার ওই পাহাড়ে। এজন্যই মুসলমানরা সেই পাহাড়কে অসীম শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। আর এজন্যই এর নাম দেওয়া হয়েছে আদম’স পিক বা এডাম’স পিক (Adam’s Peak) বা আদমের পাহাড়। এ পাহাড়ের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে রহস্য। এ পাহাড়ের চূড়ায় যে পদচিহ্ন রয়েছে সেখানে পৌঁছা খুব ঝুঁকিপূর্ণ এডভেঞ্চার। তবে অনেকে ঝুঁকি নিয়ে সেখানে গিয়েছেন। তারা নিজের চোখে ওই পায়ের ছাপ দেখে বিস্মিত হয়েছেন।

এডামস পিক শ্রীলঙ্কা

এছাড়াও দেখার জন্যে আছে পবিত্র পায়ের পদচিহ্ন, ভাগাভা কেভ, ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা এবং অপার্থিব সূর্যোদয়।

এ্যাডামস পিক এ আরোহণ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। চূড়ায় পৌঁছতে হলে যে পথ তা চলে গেছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। সেই জঙ্গল নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ। আছে বিষধর কীটপতঙ্গ। তবে চূড়ার কাছাকাছি একটি ধাতব সিঁড়ি আছে। তাতে রয়েছে ৫০০০ ধাপ এর মত। এর প্রতিটি ধাপ নিরাপদ নয়। তার ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে শীর্ষে যেতে হলে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। জটিল এক আবহাওয়ার এক অঞ্চলের মধ্যে এর অবস্থান। বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস এ পাহাড়ে আরোহণ করা যায়। বছরের অন্য সময়টাতে এতে আরোহণ অসম্ভব হয়ে ওঠে। কারণ, কাব্যিক অর্থে বলা যায় এ পাহাড় তখন মেঘের ভিতর লুকিয়ে যায়। চারদিক থেকে মেঘে জেঁকে ধরে।

এডামস পিক শ্রীলঙ্কা

সিগরিয়া- একটি অপূর্ব সুন্দর গুহামন্দির যার নাম সিগিরিয়া। ৬০০ ফুট উঁচু এক পাথর কেটে দুর্ভেদ্য প্রাসাদ বানিয়েছেন এক রাজা। প্রাসাদটি অনেকটা মৌমাছির চাকের মতো। এই পাথর সিগিরিয়া রক (Sigiriya Rock) নামে বিশ্ব বিখ্যাত। সিগিরিয়া রকের আরেক নাম লায়ন রক (Lion Rock)। চৌদ্দ শতক পর্যন্ত এটি বৌদ্ধমন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

সিগরিয়া-

দুর্গের পাথরের প্রবেশপথটি একটি বিশাল সিংহমূর্তির মতো। সিংহমূর্তির অনেকটা এখনো টিকে আছে। প্রাগৈতিহাসিক গুহাটি খ্রীস্টপুর্ব ৫০০ শতাব্দী থেকে সাধু সন্যাসীদের আশ্রম হিসেবে ব্যবহৃত হত। শোনা যায় দক্ষিণ ভারতীয় রাজা কাশ্যপ কোন যুদ্ধে পড়াজিত হয়ে ৪৯৫ খ্রীস্টাব্দ নাগাদ এই স্থানে আশ্রয় নেন এবং সুরক্ষিত একটি দূর্গ গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে এটি বৌদ্ধ মঠে পরিণত হয়। বর্তমানে এটি শ্রীলংকার একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র এবং বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

স্পেশাল খাবার– ঈডলি এবং দোসা/থোসা এখানে অহরহ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে যেমন ভাতের হোটেলে ভাত-তরকারি বিক্রি হয়, এখানে অবিকল সেরকম দেখতে হোটেল আছে রাস্তার পাশে, শুধু পার্থক্য হল ইডলি-থোসা এবং নানা রকম তরকারি বিক্রি হয়।

এছাড়া আছে কত্তুরোটি। শ্রীলঙ্কা গেলে একবার অন্তত কত্তুরোটি খাওয়া উচিৎ। সুযোগ থাকলে পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে পারেন কিভাবে বানায়। দুই হাতে দুইটা ধারালো ছুরি দিয়ে রুটি, ডিম ভাজি এবং কিছু শাকসবজি তপ্ত তাওয়ার উপর চটপট কাটাকাটি করে একটা মিশ্রণ তৈরি করে।

ঈডলি

শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া– শ্রীলঙ্কাতে সারা বছর প্রায় একরকম তাপমাত্রাই থাকে। উপকূলবর্তী এবং নিম্নাঞ্চল গুলোতে গড়ে ২৬-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। ক্যান্ডির মত উঁচু এলাকা গুলোতে তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম (১৮-২২ ডিগ্রি)। সারা বছর জুড়ে আদ্রতা বরাবরই বেশী থাকে।

কখন যাবেন শ্রীলঙ্কা– শ্রীলঙ্কার ভৌগোলিক অবস্থান এর কারনে আবহাওয়া বেশ চমৎকার। চারদিকে সমুদ্র থাকার কারনে এর আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। এখানে অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়। তাই পর্যটকদের এই সময়টা এড়িয়ে চলাই ভাল। শ্রীলঙ্কা ভ্রমন করার জন্য বছরের সবচেয়ে ভাল সময় হল ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস।

কিভাবে যাবেন– ঢাকা থেকে সরাসরি আকাশপথে কলম্বো যেতে পারেন অথবা যদি কম খরচে যেতে চান তাহলে ভারত হয়ে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনার পাসপোর্টে ভারতের ডাবল এন্ট্রি ভিসা লাগাতে হবে। ঢাকায় অবস্থিত শ্রীলঙ্কার হাইকমিশন থেকে ভিসা নিতে হবে এক্ষেত্রে। বিমানে যেতে চাইলে এয়ার ইন্ডিয়া, জেট এয়ারওয়েজ, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স, মালিন্দ এয়ার, শ্রীলংকান এয়ারওয়েজ সহ আরও অন্যান্য এয়ারলাইন্স এ ঢাকা থেকে শ্রীলঙ্কা যেতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *